হাম রোগের লক্ষণ কি? হামের কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধে করণীয়
হাম (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সের মানুষ এতে আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং টিকা গ্রহণ না করলে হাম প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আজকের ব্লগে আমরা হাম রোগের লক্ষণ, কারণ, জটিলতা এবং এর থেকে বাঁচার উপায়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
হাম রোগ কেন হয়?
হাম মূলত ‘মরবিলি ভাইরাস’ (Morbilli Virus) নামক এক ধরনের প্যারামিক্সো ভাইরাসের কারণে হয়। এটি মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় নির্গত জলকণা থেকে এই ভাইরাস সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
হাম রোগের প্রাথমিক ও পরবর্তী লক্ষণসমূহ
হামের লক্ষণগুলো সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিন পর প্রকাশ পেতে শুরু করে। একে প্রধানত দুটি ধাপে ভাগ করা যায়:
১. প্রাথমিক পর্যায় (প্রাক-র্যাশ অবস্থা)
র্যাশ বা লালচে দানা ওঠার আগে শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা যায়:
২. দ্বিতীয় পর্যায় (র্যাশ বা দানা ওঠা)
জ্বর শুরু হওয়ার ৩-৫ দিন পর সারা শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেয়। এটি সাধারণত কানের পেছন ও মুখমণ্ডল থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ঘাড়, হাত, বুক এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ৫-৬ দিন পর এই র্যাশগুলো আবার কালচে হয়ে মিলিয়ে যেতে শুরু করে।
হাম হলে করণীয় ও চিকিৎসা
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় এর সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব:
হামের সম্ভাব্য জটিলতা
সঠিক যত্ন না নিলে হাম থেকে অন্যান্য মারাত্মক রোগ হতে পারে, যেমন:
হাম প্রতিরোধে টিকার গুরুত্ব
হাম প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো টিকা (Vaccine)। শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ ‘এমআর’ (MR – Measles and Rubella) টিকা দিতে হয়। বাংলাদেশ সরকারের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি কেন্দ্রে এই টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
হাম রোগের লক্ষণ কি?
হাম রোগের লক্ষণ সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের ১০ থেকে ১২ দিন পর প্রকাশ পায়। এটি বোঝার প্রধান উপায় হলো রোগীর প্রচণ্ড জ্বর এবং শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ। এছাড়াও প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণ সর্দি-কাশি এবং চোখের লালচে ভাব দেখেও হাম শনাক্ত করা সম্ভব। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
হাম রোগের লক্ষণ
হামের লক্ষণগুলো পর্যায়ক্রমে শরীরে ফুটে ওঠে। শুরুতে নাকের পানি পড়া, শুকনো কাশি এবং গলা ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এরপর গালের ভেতরের অংশে ছোট সাদাটে দাগ (কপ্লিক স্পট) দেখা দিতে পারে। কয়েকদিন পর সারা শরীরে ছোট ছোট লালচে গুটি বের হতে শুরু করে, যা সাধারণত মুখমন্ডল থেকে শরীরের নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
হাম রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
হামের লক্ষণ প্রকাশ পেলে ঘাবড়ে না গিয়ে রোগীকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখা সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। যেহেতু এটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বর কমানোর ওষুধ এবং ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সেবন করা খুবই কার্যকর। এছাড়া শরীরে পানিশূন্যতা রোধে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার নিশ্চিত করতে হবে।
হাম রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
হাম রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই এর প্রতিকার নিশ্চিত করা ভালো। নিয়মিত টিকাদান (MR Vaccine) হাম থেকে বাঁচার একমাত্র শতভাগ কার্যকর উপায়। যদি কেউ আক্রান্ত হয়েই যায়, তবে তাকে আলাদা ঘরে রাখা এবং ব্যবহৃত জিনিসপত্র জীবাণুমুক্ত রাখা উচিত। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পুষ্টিকর খাবার রোগীকে দ্রুত সুস্থ করে তুলতে এবং অন্যকে সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. হাম রোগ কি বারবার হয়?
সাধারণত একবার হাম হলে শরীরে এর বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, তাই দ্বিতীয়বার হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে।
২. হাম হলে কি গোসল করা যাবে?
জ্বর বেশি থাকলে কুসুম গরম পানিতে শরীর মুছে দেওয়া ভালো। তবে ঠান্ডা লাগানো যাবে না।
৩. হাম কতদিন ছোঁয়াচে থাকে?
র্যাশ দেখা দেওয়ার ৪ দিন আগে থেকে র্যাশ ওঠার ৪ দিন পর পর্যন্ত এই রোগটি অন্যের শরীরে ছড়াতে পারে।
উপসংহার
হাম সাধারণ রোগ মনে হলেও অবহেলার কারণে এটি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সচেতনতাই এই রোগের প্রধান ওষুধ। শিশুদের সঠিক সময়ে টিকা নিশ্চিত করা এবং লক্ষণ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পুষ্টিকর খাবার এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ হাম আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।